আজ ৬ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২১শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

ঠাঁই নেই হাসপাতালে, ২৪ ঘণ্টায় :ভর্তি ৫৬০ ডেঙ্গু রোগী

ন্যাশনাল ডেস্ক: ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি আছেন ৪০৬ জন ডেঙ্গু রোগীরাজধানীর মালিবাগে অবস্থিত সিরাজুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে সাধাণত রোগী ভর্তি থাকে ৫০ থেকে ৬০ জন। বুধবার (২৪ জুলাই) রোগী ভর্তি ১৩৭ জন। এর মধ্যে ৬৬ জনই ডেঙ্গু রোগী। এত ডেঙ্গু রোগী রাখতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
সরেজমিনে দেখা যায়, হাসপাতালটির প্রায় সব ওয়ার্ডে রাখা হয়েছে ডেঙ্গু রোগীদের। একটি ওয়ার্ডের নামকরণই করা হয়েছে ‘ডেঙ্গু ওয়ার্ড’। এরপরও প্রতিটি ওয়র্ডে নতুন করে বেড পাতা হচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে লবিতে ও বারান্দায় বেড বসানোর চিন্তা করা হচ্ছে।
বেসরকারি এই হাসপাতালটির মতো রাজধানীর প্রায় প্রতিটি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীর অত্যধিক চাপ। এমনকী কেউ কেউ একাধিক হাসপাতাল ঘুরে রোগী ভর্তি করতে পারেননি বলেও দাবি করেছেন।
গত ২৪ ঘণ্টায় ১৩টি সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫৬০ জন। ঢাকা শহরের ৩৬টি বেসরকারি হাপসাতালে ভর্তি আছেন ৭৯১ জন। আর সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল মিলিয়ে বর্তমানে ভর্তি থাকা রোগীর সংখ্যা ২ হাজার ৫৮ জন।
সিরাজুল ইসলাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালটি ঘুরে দেখা যায়, স্থান সংকুলান না হওয়ায় গাইনি ওয়ার্ডে রাখা হয়েছে ডেঙ্গু আক্রান্ত ১০ শিশুকে। এই ওয়ার্ডে নতুন করে বেড পাতা হচ্ছে। নারী সার্জারি ওয়ার্ডে ৭ জন রোগী আছেন। এর মধ্যে ৪ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত। মেডিসিন (নারী) ওয়ার্ডের ১১ জনের ৯ জন ডেঙ্গু রোগী। স্ট্রোক সেন্টারে ৮ জনের মধ্যে ৬ জন, মেডিসিন (পুরুষ) ওয়ার্ডে ১৬ জনের সবাই এবং কার্ডিওলজি (নারী) ওয়ার্ডে ৪ জনের ৩ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত।
মগবাজারের আদ-দ্বীন হাসপাতালে বেডের অতিরিক্ত রোগীদের মেঝেতে থাকতে হচ্ছে।
কাকরাইলে অবস্থিত ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালেও ডেঙ্গু রোগীর অত্যধিক চাপ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি আছেন ৪০৬ জন। এছাড়া মিটফোর্ড হাসপাতালে ২১১ জন, ঢাকা শিশু হাসপাতালে ৬৫ জন, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ১৩০ জন, হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট হাসপাতালে ১৪২ জন এবং মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি আছেন ১২৩ জন।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশনস অ্যান্ড কন্ট্রোল রুম জানিয়েছে, এ পর্যন্ত ৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। তবে বাংলা ট্রিবিউনের অনুসন্ধানে এ পর্যন্ত ২৮ জনের মৃত্যুর সত্যতা পাওয়া গেছে।
এদিকে, ঢাকার বাইরে ১৭৯ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে কন্ট্রোল রুম। এদের মধ্যে গাজীপুরের তাজউদ্দিন মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি ৪২ জন, চট্রগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি ১৪ জনসহ মোট ৫৭ জন, কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে ১৬ জন, খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ২৪ জন, যশোরের ২৫০ বেড জেনারেল হাসপাতালে ৫ জন, বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ১২ জনসহ ২১ জন।
গত ১ জানুয়ারি থেকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন মোট ১ হাজার ২০৯ জন। এর মধ্যে এ মাসেই ভর্তি হন ৯১১ জন।
জানতে চাইলে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম নাসির উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, রিলিজ হয়েছেন ১৩২ জন। আর গতকাল মঙ্গলবার (২৩ জুলাই) একদিনেই ভর্তি হয়েছিল ২৪৫ জন, যা আমাদের জন্য রেকর্ড হয়।’ তবে এটা সত্যি যে একদিনেই ভর্তি হয়েছে ২৪৫ জন, বলেন পরিচালক নাসির।
তিনি বলেন, ‘এই হাসপাতালে সারাবছরই আমরা রোগী সামলাতে হিমশিমের মধ্যেই থাকি, তার মধ্যে নতুন যোগ হয়েছে ডেঙ্গু। কিন্তু আমরা ম্যানেজ করছি। এই বছরে ভর্তি হয়েছে ২ হাজার ২০০-এর মতো। এর মধ্যে আইসিইউতে (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) নেওয়া হয়েছে ২ জনকে।’
গত জুনে এই হাসপাতালে ভর্তি ছিল ১৩৪ জন, কিন্তু জুলাইয়ে এসে সেটা অনেক বেড়ে গেছে জানান তিনি। বলেন, ‘৯১১ জন ভর্তি হয়েছে গতকাল পর্যন্ত। আবার অনেক হাসপাতাল থেকে যাদের না করে দেওয়া হচ্ছে তাদেরও আমরা নিচ্ছি, কারণ আমাদের ‘না’ বলার সুযোগ নেই।’
বেসরকারি গ্রিন লাইফ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. নাজিয়া হক অনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, তাদের হাসপাতালে বর্তমানে ভর্তি আছেন ২৫ জন। এর মধ্যে বুধবারই ভর্তি হয়েছেন ৯ জন।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে এখন মশা নিয়ন্ত্রণই মূল টার্গেট হওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ। তিনি বলেন, ‘ডেঙ্গু প্রতিরোধে সিটি করপোরেশনে যেভাবে মশা মারে সেভাবে মশার নিধন সম্ভব নয়, এখন মশা নিধনে দরকার দুই সিটি করপোরেশনের সমন্বিত উদ্যোগ।’
অ্যাপোলো হাসপাতালের ইমার্জেন্সি থেকেই অনেককেই ফেরত পাঠানো হচ্ছেকাকরাইলে অবস্থিত ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. তানভীর আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রতিদিন এত রোগী আসছে যে নিঃশ্বাস ফেলার সময় পাওয়া যাচ্ছে না, শিশু থেকে বৃদ্ধ কেউ বাদ যাচ্ছে না। সংখ্যাটা এত বেশি যে রোগীদের ভর্তির জন্য বেড দেওয়া যাচ্ছে না।’
নিজের ডেঙ্গু আক্রান্ত এক আত্মীয়ের জন্য ইসলামী ব্যাংক সেন্ট্রাল হাসপাতালের কাকরাইল, মতিঝিল, নয়াপল্টন, মুগদা, মিরপুর শাখাসহ ঢাকার শীর্ষ বেসরকারি ৫টি হাসপাতালে খোঁজ নিয়েও তিনি সিট পাননি বলে জানান ডা. তানভীর আহমেদ। তিনি বলেন, ‘ঢাকা শহরের বেশির ভাগ হাসপাতালেই সিট ফাঁকা নেই।’
সোমা সোবহান নামের একজন অভিভাবক জানান, তিনি মর্ডান হাসপাতাল এবং গ্রিন লাইফ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে খোঁজ নিলেও সেখানে কোনও সিট পাননি।
ঢাকার অ্যাপোলো হাসপাতালের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চিকিৎসক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গত ৫ বছরের জীবনে এমন উপচেপড়া ভিড় দেখিনি।’
তিনি বলেন, ‘এত এক্সপেনসিভ এক হাসপাতাল। তারপরও রোগীদের বেড দেওয়া যাচ্ছে না। প্রতিদিন প্রায় ৫০ জনের মতো করে থাকছে ওয়েটিং।’
এই চিকিৎসক বলেন, ‘অনেককেই ইমার্জেন্সি থেকে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। এমনকী যারা আইসিইউতে রয়েছেন, কিছুটা সুস্থ হয়েছেন, তাদের এখন সাধারণ ওয়ার্ডে পাঠানো দরকার, কিন্তু সেটাও আমরা করতে পারছি না, তাদের ওয়ার্ডে পাঠানো যাচ্ছে না। কারণ, ওয়ার্ডে ডেঙ্গু রোগী দিয়ে ভর্তি।’
সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. উত্তম বড়ুয়া জানান, তাদের হাসপাতালে অনেক রোগীরাই যাচ্ছেন যারা বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হতে পারেননি সিটের অভাবে। অনেক হাপসাতালই তাদের ভর্তি নিতে পারেনি। তাই তাদের হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য একটি আলাদা কর্নারের ব্যবস্থা করেছেন তারা।
মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মাহবুবুর রহমান কচি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ডেঙ্গু রোগীদের ভর্তি করা হয় মেডিসিন বিভাগের অধীনে। নির্ধারিত ওয়ার্ড ছাড়িয়ে রোগীদের ঠাঁই হয়েছে বারান্দায়। হাসপাতালে এখন মেডিসিন ওয়ার্ডের বারান্দাতেও হাঁটার জায়গা নেই।’ মোট কথা হাসপাতালে ঠাঁই নেই, বলেন ডা. মাহবুব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এই বিভাগের আরও খবর
error: Content is protected !!
%d bloggers like this: