আজ ১০ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

সাতক্ষীরায় টাকার বিনিময়ে অযোগ্য ব্যাক্তিরাও পাচ্ছেন সম্মাননা পদক!

মাহমুদুল হাসান শাওন: সাতক্ষীরায় টাকার বিনিময়ে সম্মানের পদক কেনার হিড়িক পড়েছে। সরকার দলীয় নেতা-পাতি নেতা, শিক্ষক, ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান, মেম্বর, এনজিও পরিচালক, কতিপয় আইনজীবী, রাজনীতিবীদসহ জেলার খ্যাতি প্রিয় মানুষ ঢাকা থেকে টাকা দিয়ে কিনে আনছেন কথিত সম্মানসূচক নানা পদক, ক্রেস্ট ও সার্টিফিকেট।
বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তি ভারতের জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধী, স্বাধীন বাংলার শেষ নবাব সিরাজউদ্দৌলা, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শান্তিতে নোবেল বিজয়ী মাদার তেরেসা, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী, দক্ষিণ আফ্রিকার অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা, ভারতের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, সাহিত্যিক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, শিক্ষাবিদ খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লা, নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া, পণ্ডিত অতীশ দীপঙ্কর, বঙ্গবীর এমএজি ওসমানী, শেরেবাংলা একে ফজলুল হক, কবি সুফিয়া কামাল- এমন বিখ্যাত ব্যক্তিদের নামে দেয়া হয় সম্মাননা পদক। বিশ্বের খ্যাতিমান ব্যক্তির নাম ভাঙ্গিয়ে চলছে জমজমাট এ পদক বাণিজ্য।
এছাড়া আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসসহ বিভিন্ন বিশেষ দিবসকে কেন্দ্র করেও দেয়া হয় পদক। বিখ্যাত ব্যক্তিদের নামে নাম ও প্যাডসর্বস্ব গবেষণা পরিষদ বানিয়ে এরকম অসংখ্য পদক ও সম্মাননা দিচ্ছে অবৈধ এ সংগঠনগুলো। কিছু নিবন্ধনকৃত প্রতিষ্ঠান সচেতন ও সতর্কভাবে পদকের ব্যবসায় মেতে উঠেছে। তারা তাদের নিবন্ধনকৃত প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনকে টিকিয়ে রাখতে সম্মাননা ব্যবসাকে আয়-উপার্জনের উপায় হিসেবে বেছে নিয়েছে। কিছু নামসর্বস্ব মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানও এর সঙ্গে জড়িত। আর পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের তালিকায় থাকে রাজধানীর বাইরে থেকে আসা পুলিশ-প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তি, পৌরসভার মেয়র, ওয়ার্ড কাউন্সিলর, ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্য, সরকার দলীয় রাজনৈতিক নেতা-পাতিনেতা, শিক্ষক, টাকাওয়ালা সমাজসেবক, এমনকি আলু-পটল ব্যবসায়ী থেকে চোরাকারবারী, অবৈধ ব্যবসায়ী, ছোটখাটো এনজিও, ভুয়া হারবাল কোম্পানি, সর্বরোগ বিশেষজ্ঞ হোমিও ডাক্তার, ভণ্ড জ্যোতিষরত্ন ও বিভিন্ন পেশাজীবী। মফস্বলের এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান টাকার বিনিময়ে পদক ও সম্মাননা নিয়ে শোকেস ভর্তি করে, প্রতারণার এ স্মারক প্রয়োজনমতো প্রদর্শন করে তৃপ্ত হয় আর স্থানীয় পর্যায়ে ব্যানার পোস্টারে ছেয়ে ফেলে। এসব পদক-পুরস্কার তার কর্মপরিধির সঙ্গে প্রাসঙ্গিক কিনা তাও ভেবে দেখার প্রয়োজনবোধ করে না। অনেক সময় দেখা যায়, কেউবা চিকিৎসাসেবার জন্য সাহিত্য পুরস্কার, নয়তো ব্যবসার জন্য শিক্ষা পুরস্কার পেয়ে বসে আছে!
যেসব প্রতিষ্ঠান এসব পদক দিচ্ছে তারাও জানে না পদক পাওয়া ব্যক্তিদের সম্পর্কে । এতেই স্পষ্ট অর্থ ব্যয় করলে যে কেউ পদক নিতে পারবে।
ঢাকার ভূইফোঁড় কিছু সংগঠন চিঠি দিয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখার জন্য কতিপয় ব্যক্তির নিকট থেকে এসব পদক বাণিজ্যের প্রস্তাবনা করছে।
আর এদিকে সম্মানের কাঙ্গাল সাতক্ষীরার কতিপয় ব্যক্তি রাতারাতি বিখ্যাত হওয়ার জন্য দেদারছে টাকা দিয়ে কিনছেন শান্তি, দেশরত্ন, মানবাধিকারসহ বাহারি নামের পদক ও ক্রেস্ট। এলাকায় এসব ব্যক্তিদের প্রচারণায় অনেক ক্ষেত্রে জাতীয় পদককেও ছাপিয়ে যাচ্ছে।
শুধু তাই নয়, টাকার বিনিময়ে কেনা পদক পাওয়ার পর তা বহুল প্রচারের জন্য স্থানীয় ও জাতীয় পত্রিকায় নিউজ করে ও বিজ্ঞাপন দিয়ে নিজেদেরকে জাহির করছে নানা নামে ও খ্যাতিতে। আর এসব পদক যেসব অতিথিরা খ্যাতি প্রিয় ব্যক্তিদের হাতে তুলে দিচ্ছে তারাও অধিকাংশ ক্ষেত্রে মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে পদক প্রদান অনুষ্ঠানে হাজির হচ্ছেন।
সূত্র জানায়, লোকজনকে সম্মানে ভূষিত করার নামে বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিদের নাম ব্যবহার করে পদক বাণিজ্য চালিয়ে আসছে ঢাকার একাধিক চক্র। চক্রের সদস্যরা পদক দিয়ে সম্মানে ভূষিত করার নামে হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা। রাজধানী কেন্দ্রীক এদের তৎপরতা থাকলেও নেটওয়ার্ক রয়েছে দেশজুড়ে। দেশের গ্রামগঞ্জ থেকেও লোকজনকে ‘বিখ্যাত ব্যক্তি করে দেয়ার নামে’ ঢাকায় এনে পদক দেয়া হচ্ছে হরহামেশাই। জেলা, উপজেলা, ইউয়িনয় ও ওয়ার্ড পর্যায়ের সমাজ সেবক, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, মেম্বার, সংস্কৃতি, শিক্ষানুরাগী, সাহিত্য, ঔপন্যাসিক ও জনপ্রতিনিধি হিসেবে ‘শ্রেষ্ঠ নির্বাচিত’ এমন দাবি করে কথিত ও ভূঁইফোড় সংগঠনের ব্যানারে আয়োজকরা পদক দিয়ে আসছে।
টাকা দিয়ে কথিত পদক কিনে ‘ধন্য হচ্ছেন অযোগ্য ব্যক্তিরা’। তবে এ ক্ষেত্রে সাতক্ষীরা জেলা দেশের সব জেলা থেকে বেশ এগিয়ে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, স্বর্ণপদক দিতে ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকা, রৌপ্যপদক দিতে ২০ থেকে ৩০ হাজার আর ক্রেস্ট দেয়া হলে তার জন্য আরও ১০ হাজার টাকা করে নেয়া হয়। তবে কথিত স্বর্ণপদকে এক রতি, রৌপ্য পদকে ৪ আনা রুপা দেয়া হয়। আর ক্রেস্ট তৈরিতে লাগে ৫ থেকে ৮’শ টাকা। বাকি পুরোটাই যায় আয়োজকদের পকেটে। অনেক ক্ষেত্রে স্বর্ণ বা রৌপ্য থাকার পরিমাণ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সোনা বা রুপার পানি দিয়ে এসব পদক ধুলে পালিশ করে খ্যাতি প্রিয় ব্যক্তিদের হাতে তা তুলে দেওয়া হচ্ছে। সঙ্গে একটি সার্টিফিকেটও দিতে ভুল করছে না তারা। সূত্র মতে, কোনো ধরনের বিধিনিষেধ না থাকায় ইচ্ছেমতো নামসর্বস্ব সংগঠনের চলছে পদক বাণিজ্য। গুলিস্থান, পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজার ও কাঁটাবন এলাকা থেকে এসব পদক তৈরি করে অতিথিদের হাত দিয়ে তুলে দেয়া হচ্ছে কথিত গুণী ব্যক্তিদের। এভাবে পদক দেয়ায় পদকের অবমূল্যায়নের পাশাপাশি যেসব বক্তির নাম ব্যবহার করে পদক দেয়া হচ্ছে সেসব বরেণ্য ব্যক্তিদেরই অসম্মান করা হচ্ছে বলে একাধিক সুধীজন মন্তব্য করেছেন। রমরমা পদক বাণিজ্য বন্ধে কোনো উদ্যোগ না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন অনেকেই।
ভুঁইফোড় পদক কমিটির একাধিক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, অনেক ব্যক্তি আছে যাদের সম্পদ থাকলেও সুখ্যাতি কম। তারা সরকারের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী ও বিশিষ্ট জনদের হাত থেকে পদক নিয়ে ‘গর্বিত’ হন। ব্যক্তিগত সম্পর্কের সূত্র ধরে অতিথি নির্বাচন করে আমন্ত্রণ জানানো হয়। ভেন্যু হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাবলিক লাইব্রেরি হলরুম, মনি সিংহ ট্রাস্ট মিলনায়তন, জাতীয় প্রেসক্লাব অথবা ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির হলরুম, জাতীয় জাদুঘরের হলরুমসহ ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ অডিটরিয়াম ভাড়া করা হয়। ছাপানো হয় আমন্ত্রণপত্র। পদক বিতরণের আগের দিন সব গণমাধ্যমে চিঠি পাঠিয়ে (রিপোর্টার ও ক্যামেরাম্যান) অ্যাসাইনমেন্ট চাওয়া হয়। তবে অনেক সময় ক্যামেরা ভাড়া করেও পদক বিতরণের কাজ সেরে নেয় তারা।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ঢাকার মানবাধিকার সংস্থা, হিউম্যান রাইটস মুভমেন্ট, আলোকিত বাংলাদেশসহ কয়েকটি সংগঠন প্রথমে কোন এলাকার ১০/১২ জন উঠতি পয়সাওয়ালা টার্গেট করে চিঠি আহবান করে। সেখানে সমাজসেবায় অবদান, মানবতার সেবায় কাজ করার কথা বলে জুরি বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পদক দেওয়ার কথা বলে। চিঠিতে খরচ বাবদ আর্থিক সহায়তাও চাওয়া হয়। বলা হয় কোথায়, কোন ব্যক্তির হাত দিয়ে পদক প্রদান করা হবে। সম্মানের কাঙ্গাল কোন ব্যক্তি তাদের প্রস্তবনায় রাজি হলেই দেওয়া হয় পদক।
পদক নিতে না গেলেও এসব পদক, ক্রেস্ট ও সার্টিফিকেট কুরিয়ার সার্ভিস বা পোষ্ট অফিসের মাধ্যমে পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে।
সাতক্ষীরায় কথিত এসব পদক পাওয়া একাধিক ব্যক্তি নিজেকে স্বগর্ভে প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি এখন মহান বড় নেতা ও গর্বিত ব্যক্তি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি জানান, ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা খরচ করলেই এসব পদক পাওয়া যায়। আপনি কোন বিশ্ব বরেণ্য ব্যক্তির নামে এবং কার হাত থেকে পদক নেবেন তার উপর নির্ভর করে কত টাকা লাগবে। ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা খরচ করলেও এসব পদক পাওয়া সম্ভব।
সম্প্রতি সাতক্ষীরা সদরের ধুলিহর ইউনিয়নের নেহালপুর পল্লী উন্নয়ন উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও ব্রহ্মরাজপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি নিলিপ কুমার মল্লিক সাংগঠনিক দক্ষতা ও সমাজসেবায় বিশেষ অবদান রাখায় ‘৭১ স্মৃতি সংসদ’ নামে পদক, ক্রেস্ট ও সার্টিফিকেট পেয়েছেন। তিনি এই পদক ঢাকায় আনতে যাননি। তাকে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে পাঠানো হয়েেেছ। এসব পেয়েই তিনি গর্বিত বোধ করে সাংবাদিকদের সেগুলো দেখাতে গত ১৫ জানুয়ারী হাজির হন স্থানীয় বিডিএফ প্রেসক্লাবে। পরে তিনি এ বিষয়ে একটি রিপোর্ট করতে সাংবাদিকদের অনুরোধ করেন। সাংবাদিকদের নানান প্রশ্নের মুখে শেষমেষ তিনি পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেওয়ার ব্যবস্থা করেন।
এই শিক্ষক ও আওয়ামী লীগ নেতা একইভাবে ২০১৮ সালে সাংগঠনিক দক্ষতা ও সমাজসেবায় বিশেষ অবদান রাখায় তাকে দেওয়া ‘মাদার তেরেসা’ পদক ও সার্টিফিকেট।
এ বিষয়ে তার সাথে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এই বিভাগের আরও খবর
error: Content is protected !!
%d bloggers like this: