আজ ২০শে শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ৪ঠা আগস্ট, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

নবারুণ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মালেক গাজীর বিরুদ্ধে ১ কোটি ৮৫ লাখ টাকা আত্মসাত ও দুর্নীতির অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক: সাতক্ষীরা শহরের নবারুণ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ আব্দুল মালেক গাজীর বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতি, ১ কোটি ৮৫ লাখ টাকা আত্মসাত ও জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে নিয়োগ লাভের অভিযোগ উঠেছে। মাত্র ৬ বছরে এয়ারকন্ডিশন এবং জিমনেশিয়াম সমৃদ্ধ বিলাসবহুল বাড়ির মালিক হয়েছেন। অপরদিকে তার অপকর্মের জন্য হারিয়েছেন বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির সদর উপজেলা শাখার সদস্য পদ।
মোঃ আব্দুল মালেক গাজীর বাড়ি সাতক্ষীরার গড়েরকান্দা গ্রামে। পিতার নাম আব্দুল মান্নান গাজী। তিনি ১৯৮৯ সালে যশোর মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড থেকে মানবিক শাখায় দ্বিতীয় বিভাগে এসএসসি পাস করেন। ১৯৯১ সালে একই শিক্ষা বোর্ড থেকে একই শাখায় দ্বিতীয় বিভাগে পাশ করেন। সর্বশেষ ১৯৯৩ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তৃতীয় বিভাগে বিএ পাশ করেন। এরপর ১৯৯৯ সালের ২০ জুন সাতক্ষীরা কারিমা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক (কম্পিউটার) পদে যোগদান করেন। যোগদানের সময় তিনি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ১৯৯৫ সালের জনবল কাঠামোর শর্তাবলী পূরণ করতে গিয়ে জাল জালিয়াতির আশ্রয় নেন। জনবল কাঠামো শর্তাবলী অনুযায়ী সহকারী শিক্ষক (কম্পিউটার) পদের জন্য স্নাতকে দ্বিতীয় শ্রেণীতে উত্তীর্ণ এবং সরকার কর্তৃক নির্ধারিত প্রতিষ্ঠান কম্পিউটারে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হতে হবে। সকল পরীক্ষায় দ্বিতীয় বিভাগ থাকতে হবে। দেখা যায় স্নাতকে তিনি তৃতীয় বিভাগে পাশ করেছেন। কম্পিউটার প্রশিক্ষণের সনদপত্রও নেই। আবার কারিমা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে কম্পিউটার বিষয়ে যশোর মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের অনুমতি না থাকলেও তিনি অনুমোদন প্রাপ্তির ৮ মাস পূর্বেই সহকারী শিক্ষক কম্পিউটার হিসেবে সরকারি বেতন উত্তোলন করেন এবং বেতন নিতে থাকেন। তার টিচার্স ইনডেক্স নম্বর ঈড়স ৫১৫১০০, ইনডেক্স নম্বরে নাম ‘মোঃ আব্দুল মালেক’। ‘গাজী’ নাই। ২০০১ সালের অক্টোবর মাস থেকে তিনি সরকারি বেতন গ্রহণ করছেন। অথচ যশোর মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ড ২০০২ সালের ৩১ জুলাই কারিমা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে কম্পিউটার বিষয় খোলার অনুমতি দেয়। তার নিয়োগ নিয়ে প্রধান শিক্ষক আবু তাহের প্রশ্ন তুললে তৎকালীন বিদ্যালয়ের সভাপতি উপজেলা নির্বাহী অফিসার নিমাই চাঁদ বিশ্বাস অজ্ঞাত কারণে সহকারী শিক্ষক মোঃ আব্দুল মালেক গাজীর পক্ষ নেন। বিষয়টি এখানেই থেমে যায়। এভাবে মোঃ আব্দুল মালেক গাজী দুর্নীতি ও জালিয়াতির হাতে খড়ি দেন এবং কারিমা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ১৯৯৯ সালের ২০ জুন থেকে ২০১৪ সালের ৮ জুন পর্যন্ত সহকারী শিক্ষক (কম্পিউটার) হিসেবে চাকরি করেন। এরই মধ্যে ২০০৫ সালে ¯œাতকে ইমপ্রুভমেন্ট পরীক্ষা দিয়ে দ্বিতীয় বিভাগে উত্তির্ণ হন।
২০১৪ সালের ৯ জুন নবারুণ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে মোঃ আব্দুল মালেক গাজী প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করতে হলে ১২ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা থাকতে হয়। কিন্তু যোগদানের সময় তার অভিজ্ঞতা ছিল ১১ বছর ১০ মাস ৮ দিন। এভাবে তার অনিয়ম ও দুর্নীতির মধ্য দিয়ে নবারুন উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের জীবন শুরু হয়।
নবারুন উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে যোগদান করেই মাত্র ৪ দিন পরে ১৩ জুন সরকারি নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে প্রশাসনের অনুমতি ছাড়াই বিদ্যালয়ের মূল্যবান মেহগনি, কড়াই, দেবদারু ও কাঁঠাল গাছ কাটা শুরু করেন। এসব গাছ বিক্রির টাকা বিদ্যালয়ের তহবিলে জমা না দিয়ে আত্মসাত করেন। ৮ জন শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে আনুমানিক অর্ধকোটি টাকার ঘুষ নিয়েছেন। ২০১৪ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত তিনি পাতানো ম্যানেজিং কমিটি গঠন করে সভাপতির সহায়তায় তার সকল দুর্নীতির পথ উন্মুক্ত রেখেছেন। অর্থ কমিটি, ক্রয় কমিটিসহ বিভিন্ন প্রকারের কমিটি গঠন করার নিয়ম থাকলেও কোন কমিটি গঠন করেননি। তার যোগদানের পর থেকে বিদ্যালয়ের বিভিন্ন ঘাত থেকে প্রাপ্ত প্রায় ৪০ লাখ টাকা এবং বিশেষ সহায়তামূলক টাকার শতকরা ১০ ভাগ টাকা ৬ বছরে ৬ লক্ষাধিক টাকা বিদ্যালয়ের তহবিলে জমা দেননি। এছাড়াও ২০১৪ সালের ইনস্টিটিউশনাল এচিভমেন্ট এ্যাওয়ার্ডের এক লাখ টাকা সহকারী প্রধান শিক্ষক, সহকারী শিক্ষক ও স্কুল ম্যানেজিং কমিটির সদস্যদের মধ্যে নির্ধারিত হারে বিতরণ করার কথা থাকলেও তিনি একটি টাকাও কারোর দেননি।
নবারুণ উচ্চ বালিকা বিদ্যালযের প্রধান শিক্ষক সরকারি নিয়ম নীতি অনুযায়ী ক ও খ দুটি শাখা বিদ্যালয়ে চালু থাকা অবস্থায় তিনি নিজস্ব আইনে চালু করেছেন গ শাখা। বিদ্যালয়ের পাশে মীর শাহিনের বাড়িতে কোচিং সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেছেন। ভাড়া করা ঘরে পার্ট টাইম শিক্ষকদের দিয়ে কোচিং বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন। সেখানে নিজ বিদ্যালয়ের অষ্টম, নবম ও দশম শ্রেণীর বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রীদের কোচিং করার জন্য বাধ্য করেছেন। ২০১৪ সাল থেকে শুরু করে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণী ছাত্রীদের কাছ থেকে নিয়ম না থাকলেও রেজিস্ট্রেশন বাবদ ১০০ টাকা আদায় করে আসছেন। অষ্টম ও নবম শ্রেণীর ছাত্রীদের বোর্ড রেজিস্ট্রেশন ফি নির্ধারিত ফিয়ের চেয়ে বেশি নিয়ে থাকেন। প্রতিবছর এই দুই খাতের টাকা তিনি নিজে নিয়ে থাকেন। এভাবে প্রতি বছর সাড়ে ৮০০ থেকে ৯০০ ছাত্রীর কাছ থেকে ৮৫ হাজারেরও বেশী টাকা আদায় করে ৬ বছরে ৫ লক্ষাধিক টাকা আত্মসাত করেছেন। বই কোম্পানির কাছ থেকে প্রতিবছর ২ থেকে ৩ লাখ টাকা নিয়ে ছাত্রীদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গাইড বই পড়াতে বাধ্য করেন। এসএসসি উত্তীর্ণ ছাত্রীদের প্রশংসাপত্র ও মার্কশীট দিতে তাদের কাছ থেকে জোরপূর্বক ৫০০ টাকা নিয়ে থাকেন। সরকারি অনুদানের বই ও বিদ্যালয়ের পরীক্ষার খাতা প্রতিবছর বিক্রি করে সব টাকা নিজের পকেটে ঢোকান। এভাবে মোঃ আব্দুল মালেক গাজী কোটি কোটি টাকা আত্মসাত করেছেন। তার অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি সদর উপজেলা শাখা থেকে ২০১৯ সালে বহিষ্কার করা হয়েছে।
বিভিন্নভাবে অবৈধ পন্থায় মোঃ আব্দুল মালেক গাজী মাত্র ৬ বছরে আনুমানিক ১ কোটি ৮৫ লাখ টাকা উপার্জন করেন। এই টাকা দিয়ে সাতক্ষীরা শহরের কাটিয়া আমতলা এলাকায় শ্বশুরের দেয়া জমিতে এয়ারকন্ডিশন এবং জিমনেশিয়াম সমৃদ্ধ বিলাসবহুল বাড়ি তৈরি করেছেন। একজন প্রধান শিক্ষকের পক্ষে সারা জীবনের উপার্জিত বেতন-ভাতার টাকায় এমন বাড়ি তৈরি করা সম্ভব নয়।
নবারুণ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ আব্দুল মালেক গাজীর কাছে মোবাইলে জানতে চাইলে তিনি সকল অভিযোগের সত্যতা অস্বীকার করে বলেন, তার সকল নিয়োগ নিয়ম নীতি মেনেই হয়েছে। তিনি যে সকল কাজ করেছেন সেগুলো ম্যানেজিং কমিচির সিদ্ধান্ত মোতাবেক করেছেন। গাছ বিক্রির টাকা দিয়ে বিদ্যালয়ের বেঞ্চ তৈরী করেন। তার নিজের কোন কোচিং সেন্টার নেই। তার শ্বশুর বাড়িতে যে বাড়িটি আছে তা তার শ্যালকদের। তার বিদ্যালয়ের চার জন শিক্ষক তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এই বিভাগের আরও খবর
error: Content is protected !!