আজ ১০ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

করোনা ভাইরাস: গো-আরক, গঙ্গাজল, গোবরের পায়েস

জাহাঙ্গীর আলম কবীর: গোমূত্র সেবন করলে করোনা ভাইরাস একেবারেই কাছে ঘেঁষতে পারবে না। আর যারা ওই প্রাণঘাতী সংক্রমিত হয়েছেন, তাদের অসুখ ভালো হয়ে যাবে। ভারতের কিছু মানুষ এমন বিশ্বাস পোষণ করেন। আর তাদেরই একদল মানুষ কলকাতায় গোমূত্র পানের অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল ১৫ মার্চ সোমবার। ওই অনুষ্ঠানে যারা এসেছিলেন তাদের গোমূত্র পান করানো হয়েছে। গোমূত্রের এমনই ‘অলৌকিক’ ক্ষমতায় বিশ্বাস করে উদ্যোক্তাদের ডাকে সাড়া দেন বহু মানুষ।
করোনা ভাইরাস ঠেকাতে পুরো বিশ্বের চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা যখন গলদঘর্ম হচ্ছেন, তখন হিন্দু মহাসভার এমন উদ্ভট বিশ্বাস আর কাজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হাস্যরসের সৃষ্টি করেছে।  

‘গো-আরক’ খেয়েছিলেন শিবু
করোনা-আতঙ্কে ‘গো-আরক’ খেয়েছিলেন। গলা ও বুকে ব্যথা নিয়ে আপাতত ঝাড়গ্রামের শিবু গরাইয়ের ঠাঁই হয়েছে জেলা সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে। মেডিসিন ওয়ার্ডে জায়গা মেলেনি। তাই মেঝেই ভরসা। এখন শিবু অবশ্য বলছেন, ‘খুব ভুল করেছি। করোনা ঠেকাতে আমার মতো আর কেউ যেন গোমূত্র পান না করেন।’
ঝাড়গ্রাম শহরের চার নম্বর ওয়ার্ডের জামদা এলাকায় থাকেন শিবু। বাড়িতেই কাপড়ের দোকান রয়েছে তাঁর। স্ত্রী, দুই ছেলে নিয়ে সংসার। কয়েক দিন আগে বন্ধুদের সঙ্গে মায়াপুরে বেড়াতে গিয়েছিলেন তিনি। ফেরার সময়ে সেখান থেকে ১৮০ টাকা দিয়ে কিনে আনেন গোমূত্রের শিশি। তাতে লেখা ‘গো-আরক’। বছর বিয়াল্লিশের শিবু জানান, বিক্রেতা জানিয়েছিলেন, এক থেকে দুই ছিপি ওই ‘গো-আরক’ নিয়মিত খেলে শরীরের রক্ত দোষ কাটে। করোনা-সহ নানা রকম শারীরিক ব্যাধি থেকেও মুক্তি পাওয়া যায়। করোনা-ভয় কাটাতে বিশ্বাস করেই ১৬ মার্চ মঙ্গলবার সন্ধ্যায় এক ছিপি গোমূত্রের আরক খেয়েছিলেন শিবু। তার পরেই শরীরে নানা অস্বস্তি শুরু হয়। গলা ও বুক জ্বলতে থাকে। শিবুকে পরিজনেরা নিয়ে যান ঝাড়গ্রাম জেলা সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের জরুরি বিভাগে। শারীরিক অবস্থা দেখে শিবুকে ভর্তি করে নেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
বুধবার শিবু বলেন, ‘পরিবারে আমিই রোজগেরে। তাই আমার করোনা হলে ব্যবসা লাটে উঠবে, এমন আশঙ্কাতেই গোমূত্রের আরক খেয়েছিলাম। অন্ধবিশ্বাসে ভেবেছিলাম, প্রতিষেধকের কাজ করবে। অসুস্থ হয়ে বুঝেছি কী ভুল করেছি।’

দিল্লির পার্টিতে চিয়ার্স বলে গোমূত্র পান, সঙ্গে গোবরের পায়েস!
৪ মার্চ বুধবার অভিনব এক ‘পার্টি’র আয়োজনের ঘোষণা দেয় ভারতের অখিল ভারত হিন্দু মহাসভা। ৭ মার্চ শনিবার দিল্লিতে সেই পার্টি অনুষ্ঠিত হলো। পার্টিতে আগত অতিথিরা সবাই পান করলেন গোমূত্র। খেলেন গোমূত্রের প্রসাদ।
‘টি পার্টি’র অনুকরণে তারা ‘গোমূত্র পার্টি’র আয়োজন করে। হিন্দু মহাসভার দাবি, করোনাভাইরাস রুখতে একমাত্র ‘মহৌষধি’ গোমূত্র এবং গোবর। মহাসভার সভাপতি চক্রপাণি মহারাজ জানান, দিল্লিতে যাতে করোনার প্রকোপ ব্যাপক হারে ছড়িয়ে না পড়ে, তার জন্যই এই ‘গোমূত্র পার্টি’র আয়োজন।
কল লাগানো স্টিলের পাত্রের গায়ে লেখা ‘পবিত্র গোমূত্র প্রসাদম’। অর্থাৎ পবিত্র প্রসাদী গোমূত্র। পাশে উপুড় করে রাখা মাটির ভাঁড়। একজন করে আসছেন আর ভাঁড় ভরে চুমুক দিচ্ছেন সেই প্রসাদী তরলে। অনেকের আশ যেন আর মেটে না! ভাঁড় খালি হতেই হাঁক পাড়ছেন, আউর লাও!
পার্টিতে গোবরের পায়েসের আয়োজনও করা হয়েছিল। বালতি হাতে ওয়েটার বলছিলেন, ‘রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা বাড়ানো পঞ্চগব্য মেশানো আছে এই পায়েসে। গোবর, গোমূত্র ইত্যাদি।মাটির ভাড়ে গোমূত্রে ভরে ‘চিয়ার্স’ বলে পান করছিলেন অনেকেই।
হিন্দু মহাসভার অধ্যক্ষ চক্রপানি মহারাজ বললেন, ‘চীনে জীবহত্যার পাপ চরমে। করুণার আকাল। তা থেকেই করোনা অসুরের জন্ম। সকালে পঞ্চগব্য, গোমূত্রের ভোগ দেয়া হয়েছে তাকে। প্রার্থনা করা হয়েছে শান্ত হতে।’
চক্রপাণি মহারাজ ভারতের এক সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘যেমন আমরা চা-চক্রের আয়োজন করি, তেমনই গোমূত্র পার্টির আয়োজন করছি। সেখানে করোনাভাইরাস কী এবং কীভাবে গরু থেকে প্রাপ্ত জিনিসপত্র খেয়েই এই ভাইরাসমুক্ত থাকা যায় সে সব নিয়ে সচেতনতার প্রার করা হবে।’ মহাসভার সভাপতি বলেন, ‘এমন কাউন্টার থাকবে, যেখান থেকে পার্টিতে আসা লোকজনকে গোমূত্র খাওয়ার জন্য দেওয়া হবে। পাশাপাশি আমরা গোবরের কেক বা ঘুঁটে, গোবর দিয়ে তৈরি আগরবাতিও রাখব। এগুলি খেলে বা ব্যবহার করলে করোনা ভাইরাস সঙ্গে সঙ্গে মারা যাবে।’
প্রথমে দিল্লিতে মহাসভার সদর কার্যালয়ে এই পার্টির আসর বসে। তারপর সারা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তা ছড়িয়ে দেওয়ার ঘোষণা দেয়।
চক্রপাণি মহারাজ বলেন, ‘জীব হত্যা মহাপাপ, এই বার্তা আমরা ছড়িয়ে দিতে চাই। করোনাভাইরাস যে জীব হত্যার কারণেই ছড়িয়েছে, সেটা প্রচার করতে চাই। জানি, অনেকেই আমার কথা বিশ্বাস করবে না। কিন্তু ভারতে যে হেতু অধিকাংশই নিরামিষাশী, তাই এখানে এই ভাইরাস ছড়াবে না।’
তিনি বলেন, ‘যজ্ঞ অনুষ্ঠানের জন্য ভারতে করোনাভাইরাস শান্ত ছিল। কিন্তু তেলঙ্গানার অজ্ঞ ও অহঙ্কারী মন্ত্রীরা প্রাণী হত্যা করে এবং যেভাবে সর্বসমক্ষে মাংস খেয়ে করোনাভাইরাসকে উস্কেছেন, তাতে ভারতেও করোনার ভয়াল রূপ দেখার আশঙ্কা তৈরি হয়ে গিয়েছে। এই মন্ত্রীদের সময় থাকতে থাকতে করোনার কাছে ক্ষমা চেয়ে নেওয়া উচিত। না হলে অনর্থ হয়ে যাবে, যা কেউ আটকাতে পারবে না।’ চক্রপাণি মহারাজ বলেন, গোমূত্র খান, আর নিরামিষভোজী হয়ে যান, তা হলেই পালাবে করোনা।’

করোনা রুখতে কলকাতায় গোমূত্র পান: আয়োজক বিজেপি নেতা
করোনা সংক্রমণ ঠেকানোর নামে আর এক ‘সংক্রমণ’। গোমূত্র পান করা এবং করানোর হুজুগ দিল্লি থেকে সংক্রামিত হল কলকাতাতেও। দিল্লিতে গোমূত্র পার্টির আয়োজন করেছিল হিন্দু মহাসভা, উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের প্রধান চক্রপাণি মহারাজ নিজেও। ১৫ মার্চ সোমবার কলকাতায় গোমাতার পুজো এবং গোমূত্র পানের আসর বসালেন বিজেপি নেতা। করোনার কোনও প্রতিষেধক যে হেতু এখনও আবিষ্কার হয়নি, সে হেতু গোমূত্র পানই বাঁচার একমাত্র উপায় জোর গলায় বললেন সেই বিজেপি নেতা।
জোড়াসাঁকো এলাকার বিজেপি নেতা নারায়ণ চট্টোপাধ্যায় সোমবার গোমূত্র পান করালেন অনেককে। ওই গোমূত্র পানের অনুষ্ঠানের আয়োজক ছিলেন তিনি। তিনি নিজেও সেখানে গোমূত্র পান করেন। প্রথমে ধুপ-ধুনো-ফুল-ফল-মিষ্টান্নে গোমাতার পুজো, রুটি খাইয়ে গরু এবং বাছুরের সেবা। তারপরে ঘটিতে করে গোমূত্র বিলি। প্রকাশ্যেই স্থানীয় লোকজনের মুখে আলগোছে গোমূত্র ঢেলে দিতে দেখা গিয়েছে ওই বিজেপি নেতাকে। করোনা রোধের নিদান হিসেবে গোমাতার পুজো এবং গোমূত্র পানের ওই আসরে যাঁরা হাজির হয়েছিলেন, তাঁদেরও বেশ অকাতরেই গোমূত্র পান করতে দেখা গিয়েছে। ঘটনাস্থলে হাজির এক পুলিশ কনস্টেবলের হাতেও গোমূত্র ঢেলে দেন বিজেপি নেতা। হাতের তালুতে চুমুক দিয়ে তিনি তা খেয়েও নেন।
শুধু গোমূত্র অবশ্য নয়, লাড্ডুও ছিল গোমাতার প্রসাদ হিসেবে। তবে লাড্ডু খেতে হলে আগে গোমূত্র পান করতে হবে এই রকম শর্ত ছিল বলে জানা গিয়েছে।

গোমূত্র পানের পক্ষে জোর সওয়াল দিলীপ ঘোষের
গোমূত্র পান করা বা করানোয় আপত্তির কিছুই নেই বলে মন্তব্য করলেন রাজ্য বিজেপির সভাপতি দিলীপ ঘোষ। ‘এই প্রথম কি কেউ গোমূত্র খাচ্ছেন? বাড়িতে নারায়ণের সিন্নি দেওয়ার সময়ে যে পঞ্চগব্য ব্যবহৃত হয়, তাতে গোমূত্র থাকে না?’ প্রশ্ন দিলীপ ঘোষের। আর রাজ্য সভাপতির এই অবস্থান জানার পরেই সুর বদল অন্য নেতাদেরও। ‘গোমূত্র পানে অপকারই হয়, এমনটাও তো আমরা জানি না। গবেষণা হোক।’ বললেন রাজ্য বিজেপির সাধারণ সম্পাদক সায়ন্তন বসু।
সংসদের অধিবেশন চলায় দিলীপ ঘোষ যখন দিল্লিতে তখন জোড়াসাঁকো এলাকার বিজেপি নেতা নারায়ণ চট্টোপাধ্যায় গোমাতার পুজো এবং স্থানীয় লোকজনকে গোমূত্র পান করানোর বন্দোবস্ত করেছিলেন। করোনা রুখতে এই উদ্যোগ বলে জানিয়েছিলেন নারায়ণ। করোনার কোনও প্রতিষেধক যখন বেরোয়নি, তখন একমাত্র গোমূত্রই করোনা রুখতে পারে বলে তিনি জোর গলায় দাবি করছিলেন।
জোড়াসাঁকোর এক গোয়ালঘরে ওই অনুষ্ঠানের অন্যতম এক উদ্যোক্তা জানিয়েছেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি গরুর মূত্র খেলে আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেড়ে যায়। এর ফলে আমাদের শরীর করোনা ভাইরাস থেকে রক্ষা পাবে।’

গোমূত্র ‘গঙ্গাজল’একশ্রেণির স্বাস্থ্যকর পানীয়!
‘পঞ্চগব্য’ নামে একটি পুজো-উপাচারের নাম হয়তো অনেকেই জানেন। মুসলিমরা সবাই না জানলেও হিন্দুরাতো জানেনই। তবে যেসকল হিন্দু পুজোপার্বণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নন, তাঁদের জানা নাও থাকতে পারে। কেন না, সবহিন্দু ব্রাহ্মণ নন। আর ব্রাহ্মণ ব্যতীত অন্যদের পুজোপার্বণের অধিকারই নেই। তাছাড়া সবব্রাহ্মণও পুজো করতে পারেন না। তার কারণ হচ্ছে, নানা আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেই পুজোর উপযুক্ত ব্রাহ্মণ হয়ে উঠতে হয়। এ ছাড়া ব্রাহ্মণের জায়া-কন্যারাও ব্রাহ্মণ্যত্ব লাভ করতে পারেন না।
হ্যাঁ, পঞ্চগব্য হচ্ছে: গোমূত্র, গোময়, দুগ্ধ, দই ও ঘৃতের মিশ্রণ। পঞ্চগব্য ব্যতীত কোনও পুজোর অনুষ্ঠান যেমন হয় না; তেমনই পবিত্রতাও সম্পন্ন করা যায় না। তাই পঞ্চগব্য হিন্দুদের কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ এবং পবিত্র।
পঞ্চগব্যের দুধ, দধি ও ঘৃত নিশ্চয়ই স্বাস্থ্যকর ও উপাদেয়। এসবের সমন্বয়ে প্রস্তুত প্রসাদ গ্রহণে কোনও সমস্যা থাকবার কথা নয় ভক্তদের। কিন্তু প্রসাদে অনিবার্যভাবে গোমূত্র এবং গোময় বা গোবরের যদি সামান্য অংশও থাকে তাহলে কোনও রুচিবোধসম্পন্ন এবং বিজ্ঞানমনষ্ক মানুষের কাছে কি তা গ্রহণীয় হতে পারে? তবে বিষয়টি গোপন রাখা হয়।
ব্যায়ামবিদ রামদেব একটি সফটড্রিংক বাজারজাত করেছেন। নাম ‘গঙ্গাজল’। এটির প্রধান উপাদান হচ্ছে গোমূত্র। এ গঙ্গাজল এখন ভারতের জনপ্রিয় পানীয়। প্রায় সব হোটেল-রেস্টুরেন্টে এ পানীয় পাওয়া যায়। আমরা যেমন পেপসি কোলা, সেভেন আপ, ফান্টা, মিরিন্ডা ইত্যাদি পান করি; ঠিক তেমনই গঙ্গাজল ভারতের সর্বত্র জনপ্রিয়। ভারত ভ্রমণকারী বাংলাদেশিরাও গঙ্গাজল গিলতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছেন বলে জানা যায়। তবে পানীয়টি যে ‘গোমূত্রজাত’ তা অনেক বাংলাদেশিই জানেন না।

গরুর দুধের দামকে পিছনে ফেলে দিয়েছে গোমূত্রের দাম!
আধুনিক চিকিৎসাশাস্ত্র গোমূত্রের রোগ প্রতিরোধক গুণের দাবিকে বিন্দুমাত্র স্বীকৃতি না দিলেও ব্যবসায়ী মহলের খবর, গুজরাত, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশের মতো রাজ্যের পথ অনুসরণ করে পশ্চিমবঙ্গ তথা কলকাতায় গত তিন-চার বছরে তুঙ্গে উঠেছে গোমূত্রের বিক্রি। বিভিন্ন জায়গায় শুরু হয়েছে ‘গোমূত্র চিকিৎসা ক্লিনিক’। বিক্রি হচ্ছে ‘গোমূত্র ক্যাপসুল’ এবং ‘ডিস্টিল্ড’ ও ‘মেডিকেটেড’ গোমূত্র!
ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজে ফার্মাকোলজির শিক্ষক স্বপন জানার কথায়, ‘গোটাটাই ভন্ডামি। গাছগাছালি থেকে রাসায়নিক বের করে ওষুধ হতে পারে। তার ফার্মাকো কাইনেটিক্স ও ডায়নামিক্স রয়েছে। গোমূত্রের এমন কিছুই নেই।’
অথচ কলকাতা শহরেই এর চাহিদা দেখে ভিন রাজ্যের নামী গোশালা থেকে গোমূত্র আনিয়ে ব্যবসা করছেন একাধিক এজেন্ট। তাঁদেরই অন্যতম ললিত আগরওয়াল বললেন, গত কয়েক বছরে এখানে গোমূত্রের চাহিদা পাঁচ গুণ বেড়েছে। মাসে প্রায় ১০ হাজার লিটার গোমূত্র বিক্রি হয় পশ্চিমবঙ্গে। এ রাজ্যে তেমন উৎপাদন নেই। তাই তারা নাগপুর থেকে আনিয়ে দেয়। ললিতের কথায়, ‘এক লিটার গোমূত্রের দাম ৩৫০ টাকা। আর ওখান থেকে আনা দুধ আমরা বিক্রি করি ১৫০ টাকা লিটারে।’
সাধারণত কলকাতায় গরুর দুধ লিটার প্রতি ৩৫-৪৮ টাকার মধ্যে মেলে। তার প্রায় দ্বিগুণেরও বেশি দামে বিকোচ্ছে গোমূত্র। নাগপুরের যে ‘গো বিজ্ঞান অনুসন্ধান কেন্দ্র’ থেকে ললিতেরা কলকাতায় গোমূত্র ও দুধ আনান, সেটি মূলত আরএসএস-পোষিত সংস্থা। গোটা ভারতে তাদের ৫০০-র বেশি গোশালা রয়েছে। সেখানকার চিফ কোঅর্ডিনেটর সুনীল মানসিংহের দাবি, ‘পশ্চিমবঙ্গেও আমরা ১৬টি জায়গায় গোশালা শুরু করেছি। সেখান থেকেও কিছুদিনের মধ্যে ডিস্টিল্ড গোমূত্র মিলবে।’
ক্যালকাটা পিঁজরাপোল সোসাইটি নামে একটি সংস্থার পাঁচটি গোশালা রয়েছে পশ্চিমবঙ্গে। সেখানকার কোঅর্ডিনেটর সর্বেশ্বর শর্মা বলেন, ‘প্রতি বছর ২০-২৫ শতাংশ হারে গোমূত্রের বিক্রি বাড়ছে। কলকাতায় মাসে প্রায় ৩ হাজার লিটার গোমূত্র বিক্রি হয় আমাদের। ১ লিটার গোমূত্রের দাম পড়ে ১৭৫ টাকা। সেখানে আমরা ১ লিটার দুধ বিক্রি করি ৫০ টাকায়।’ মধ্যপ্রদেশের ইনদওরে গোমূত্র থেরাপি ক্লিনিক চালাচ্ছেন ব্যবসায়ী বীরেন্দ্র জৈন। ফোনে বললেন, ‘কলকাতাতেও আমাদের অনেক রোগী আছে। অনেক নেতারা ওষুধ নিয়ে যান। মেডিকেটেড গোমূত্র ২১০ টাকা করে লিটার বিক্রি করি। মাসে আড়াই থেকে তিন হাজার লিটার বিক্রি হয়।’

শেষ কথা
দীর্ঘকাল বাম প্রভাবে থাকা রাজ্যে গোমূত্রে এমন ভক্তি? সমাজতত্ত্বের শিক্ষক অভিজিৎ মিত্রের ব্যাখ্যায়, ‘পশ্চিমবঙ্গের মানুষ ভিন্ন সংস্কৃতি গ্রহণে একটু বেশি এগিয়ে। এ রাজ্যে এখন গণেশ পুজো, ধনতেরস, বিয়েতে মেহন্দির ধুম। তেমন ভাবেই চলে এসেছে গোমূত্র। ক্রমবর্ধমান ‘মাল্টিরেসিয়াল সোসাইটি’ বা হিন্দিবলয়ের মানুষের সংখ্যাবৃদ্ধির প্রভাবও এর পিছনে রয়েছে।’
করোনা রুখতে গোমূত্র পান! তা-ও কলকাতার বুকে! ঘটনার ছবি সামনে আসতেই প্রবল প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে রাজনৈতিক শিবিরে। কলকাতার ডেপুটি মেয়র তথা মেয়র পারিষদ (স্বাস্থ্য) অতীন ঘোষ তীব্র কটাক্ষ ছড়ে বলেছেন, ‘যাঁদের চিড়িয়াখানায় থাকার কথা, তাঁরা বাইরে থাকলে এই রকমই হয়।’ আর কংগ্রেস বিধায়ক মনোজ চক্রবর্তীর উদ্বেগ, ‘বিজ্ঞানের উল্টো পথে হেঁটে করোনা সংক্রমণ রোখার নামে যে ভাবে গোমূত্র পান করানো হচ্ছে, তার ভয়ঙ্কর ফল হতে পারে।’ তাঁর প্রশ্ন, ‘গ্রামাঞ্চলে মানুষ যদি দলে দলে গোমূত্র পান করে নতুন কোনও সংক্রমণের শিকার হন, তা হলে কে দায়ী থাকবে?’
যাই হোক, গরু ভারতীয় হিন্দুদের কাছে দেবতা। দেবতার মল বা গোবর এবং মূত্রও দেবতুল্য। তাই গোবর ও গোমূত্র ওদের কাছে বর্জ্য বলে গণ্য হবে কেন? বরং গোবর্জ্য স্বাস্থ্যকর এবং উপাদেয় বস্তু। তাই তাঁরা তা ঔষধি গুণসম্পন্ন মনে করতেই পারেন। তবে গোবর এবং গোমূত্র  মুসলিমদের কাছে অপবিত্র। হারাম। এর সামান্য অংশ পরিধেয়তে লেগে থাকলে তা পরিধান করে সালাত আদায় করা যাবে না। তবে গরুর গোশত খেতে এবং দুগ্ধ পানে মুসলিমদের বাধা নেই।
গোমূত্রের ব্যবসায়ী ও এর সেবকরা এর যতোই গুণকীর্তন করুন না কেন, বিজ্ঞানীরা এর ঘোরবিরোধী। উল্লেখ্য, একশ্রেণির ভারতীয় বিজ্ঞানী নাকি গোমূত্রের উপকারিতা নিয়ে ব্যাপক গবেষণা শুরু করে দিয়েছেন। তবে এখনও তা প্রমাণ করতে পারেননি। কিন্তু হুজুগপ্রিয় ভারতীয়রা গোমূত্র গিলতে গিলতে বুঁদ হয়ে পড়ছেন। তাই হু হু করে বাড়ছে ভারতব্যাপী গোমূত্রের মূল্য। অনেকে প্রচার করছেন এতে স্বর্ণ রয়েছে। তাই গোমূত্রের রঙ সোনালি। অবশ্য মানুষের মলও প্রায় স্বর্ণালী। তাই বলে এও কি আগামীতে কোনও ভারতীয় গ্রহণ শুরু করবেন?
সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এই বিভাগের আরও খবর
error: Content is protected !!
%d bloggers like this: