আজ ৭ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২২শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

ঝাউডাঙ্গা ইউনিয়নে খাদ্য বান্ধব কর্মসূচির চাল বিতরণে তুঘলকি কারবার টাকার বিনিময়ে কার্ড পেয়েছে কোটিপতি ব্যবসায়ী স্বচ্ছল অস্বচ্ছল ব্যক্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক: সাতক্ষীরা সদর উপজেলার ঝাউডাঙ্গা ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডে খাদ্য বান্ধব কর্মসূচির (১০ টাকা কেজি চালের) কার্ড ও কার্ডের চাল বিতরণ নিয়ে তুঘলকি কারবার ঘটেছে। ব্যাপক দুর্নীতি ও স্বজন প্রীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। কোটিপতি, ব্যবসায়ী ও ট্রাক মালিক, স্বচ্ছল ব্যক্তি, গরু ও মুরগির খামারমালিক, মৃত ব্যক্তি, ভিন্ন ওয়ার্ডের লোক এবং এক ব্যক্তির নামে খাদ্য বান্ধব কর্মসূচির কার্ডসহ একাধিক কর্মসূচির কার্ড বিতরণ করা হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে টাকার বিনিময়ে তাদের কার্ড দেয়া হয়েছে। এক ব্যক্তির নামের কার্ডে অন্য ব্যক্তি চাল নিয়ে গেছে। চেযারম্যান, মেম্বার ও ডিলারের বিরুদ্ধে স্বজন প্রীতির অভিযোগ রয়েছে বিস্তর।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে ঝাউডাঙ্গা ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মাধবকাটি, দিগরডাঙ্গা ও বলাডাঙ্গা গ্রামের ১৯২টি পরিবারের মধ্যে খাদ্য বান্ধব কর্মসূচির কার্ড বিতরণ করা হয়। ২০১৬ এবং ২০১৭ সালে এই কার্ডে একবার করে চাল বিতরণ করা হয়। তখন একবারও কেউ চাল পায়নি। ২০১৮ সালে ৫ বার এবং ২০১৯ সালে ৫ বার চাল দেয়া হয়। ২০২০ সালে ২ বার চাল দেয়া হয়েছে। ২০১৮ সাল থেকে মোট ১২ বার চাল দেয়া হয়। এ  কয়েক বারে কার্ড গ্রহীতাদের কেউ একবারও চাল পায়নি, কেউ ১ বার, কেউ ২ বার, কেউ ৩ বার, কেউ সর্বোচ্চ ৫ বার চাল পেয়েছে। কার্ড ও ডিলারের রেজিস্টার খাতায় গ্রহীতাদের স্বাক্ষর ও টিপ সই খালি চোখে দেখলেই তা বোঝা যায়।
খাদ্য বান্ধব কর্মসূচির কার্ড পেয়েছে ঝাউডাঙ্গা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আজমল উদ্দিনের মামাতো ভাই মাধবকাটি গ্রামের শাহিনুর রহমান, হাফিজুর রহমান, মামাতো ভাই বৌ ফাতেমা খাতুন, খাদিজা খাতুন ও মাসুদা খাতুন। ফাতেমা খাতুন আজমল উদ্দিনের মামাতো ভাই ও খাদ্য বান্ধব কর্মসূচির মাধবকাটির ডিলার শফিউর রহমানের স্ত্রী। আর শিশু নেই তবু হাফিজুর রহমানের স্ত্রীর নামে রয়েছে শিশু কার্ড। এরা সবাই পল্ট্রি খামারী।
মাধবকাটি গ্রামের মুকুল হোসেনের নামে রয়েছে খাদ্য বান্ধব কর্মসূচির কার্ড এবং তার স্ত্রীর নামে রয়েছে শিশু নেই তবু শিশু কার্ড। রুহুল আমিনের নামে রয়েছে খাদ্য বান্ধব কর্মসূচির কার্ড এবং তার স্ত্রীর নামে রয়েছে শিশু নেই তবু শিশু কার্ড। আরশাফ আলীর নামে রয়েছে খাদ্য বান্ধব কর্মসূচির কার্ড এবং বয়স্ক ভাতার কার্ড। তার স্ত্রী আলেয়ার নামে রয়েছে শিশু নেই তবু শিশু কার্ড। আর রওশন আরার নামে রয়েছে স্বামী জীবিত থাকলেও বিধবা ভাতার কার্ড, খাদ্য বান্ধব কর্মসূচির কার্ড এবং নিঃসস্তান হলেও শিশু কার্ড। আর স্বামী আব্দুর রশিদের নামে আছে ভাতার বয়স না হলেও বয়স্ক ভাতার কার্ড। এগুলো তারা সংগ্রহ করেছে কার্ড প্রতি ৩ থেকে ৪ হাজার করে টাকা দিয়ে। এই টাকা সংগ্রহ করার দায়িতাব পায় চেয়ারম্যান ও মেম্বররের নিজস্ব ব্যক্তি নজরুল ইসলাম, শফিকুল ইসলাম এবং চেয়ারম্যানের মামাতো ভাই মশিউর রহমান।
বলাডাঙ্গা গ্রামের ইজদানের ছেলে রফিকুল ইসলাম খাদ্য বান্ধব কর্মসূচির কার্ডে ১৪ বারের মধ্যে চাল পেয়েছে ৫ বার। বাকি ৯ বার ভূয়া টিপ সই দিয়ে চাল নিয়ে গেছে অন্যলোকে। স্বাক্ষর ও টিপ সই দেখলেই তা বোঝা যায়। মাধবকাটির হেরমত আলী চাল পেয়েছে ১ বার। আর একবার ১০ কেজি চাল। একই ভাবে মাধবকাটির বিধবা আছিয়া খাতুন, আনোয়ারা খাতুন, ইকবাল হোসেন, জাহানারা খাতুন, নূরজাহান খাতুন, সফিজা বেগম, দিগরডাঙ্গা গ্রামের গোলাম মোস্তফা, মাসুমা খাতুন, সফিয়া খাতুন, তানজিলা খাতুন, নুরুন নাহার, নাছিমা খাতুনরা কেউ চাল পেয়েছে ১ বার, কেউ ২ বার, কেউ ৩ বার, কেউ ৪ বার, কেউ সর্বোচ্চ ৫ বার। আর ঝাউডাঙ্গার নুরুননেছার নামে কার্ড রয়েছে মাধবকাটি গ্রামের বাসিন্দা হিসাবে। মৃত ব্যক্তি মাধবকাটির লবকৃষ্ণ মন্ডলের নামের কার্ডে চাল তোলা হয়েছে কর্মসূচির শুরু থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত। আবার দেড় হাজার, দু’হাজার টাকা সেলামী দিয়ে অন্যের কার্ডে দু’চালান, তিন চালান চাল তুলেছে মাধবকাটির নূর ইসলাম, মঞ্জুয়ারা, মর্জিনা খাতুন, মাসুদা খাতুন ও সালমা খাতুনরা। একই পন্থায় দুই তিন চালান খাদ্য বান্ধব কর্মসূচির চাল তুলেছেন মাধবকাটি, দিগরডাঙ্গা ও বলাডাঙ্গার দু’শতাধিক মানুষ। ক্যামেরার সামনে তারা স্বীকার করে, ৭ ওয়ার্ডের মেম্বার ইকবাল আনোয়ার সুমনকে দেড় থেকে দু’হাজার টাকার দিয়ে তারা এসব কার্ডে চাল তুলেছে। খাদ্য বান্ধব কর্মসূচির কার্ড পেয়েছে ৮ বিঘা জমির ও গরুর খামার মালিক মাধবকাটির মোকারম হোসেন, বলাডাঙ্গার ব্যবসায়ী ও ট্রাক মালিক মৃত আব্দুর রউফের পুত্র আরিফুর রহমান এবং একই গ্রামের কোটিপতি রফি সরদারের ছেলে হাসানুজ্জামান বাবু। এমনি বিস্তর অনিয়ম হয়েছে বলাডাঙ্গা গ্রামেও।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এই বিভাগের আরও খবর
error: Content is protected !!
%d bloggers like this: