আজ ৮ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৪শে অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

কলির কৃষ্ণ সাংবাদিক –

জাহাঙ্গীর আলম কবীর

রস্তায় বের হলেই দেখা যায় সাংবাদিকদের ছড়াছড়ি। আজগুবি সব পত্রিকার সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে শত শত যুবক। মাজায় ঝোলানো পত্রিকার কার্ড। কারো কারোর হাতে থাকে ভিডিও ক্যামেরার বুম। এদের বেশিরভাগই নেশাখোর,  মাদকাশক্ত, গাঁজাখোর, ইয়াবার ডিলার, চাঁদাবাজ, আদালত পাড়ার দালাল, ধান্দাবাজ, ছিচকে রংবাজ, পতিতাদের দালাল, সবজি বিক্রেতা, চা বিক্রেতা, বখাটে, রডমিস্ত্রি, রাজমিস্ত্রি,  টাইলস মিস্ত্রি, সেনেটারী মিস্ত্রি, কারেন্ট মিস্ত্রি, গাড়ির হেল্পার, ড্রাইভার, কন্ট্রাক্টর, মুদির দোকান, পান দোকানদার, চুল কাটা নাপিত, বর্ডারে ইমিগ্রেশনে পাসপোর্ট দালাল, ধুড় পাচারকারী ও হুন্ডি ব্যবসায়ী। সাংবাদিকতায় এসেছে বিভিন্ন পেশার অপরাধীরা। ষ্টুডিও এন্ড ভিডিও দোকানদার, ইলেক্ট্রিশিয়ান, মুদি দোকানি, কবিরাজ, সরকারি বে-সরকারি স্কুল শিক্ষক, এমনকি রাজনীতি দলের নেতারাও এখন সাংবাদিক পরিচয় দিচ্ছে। ফেসবুকিং করে এমন অনেকেই নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে মোটর সাইকেলের সামনে প্রেস লাগিয়ে বিভিন্ন এলাকায় দেদারছে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
সাংবাদিকতায় একদিনেরও অভিজ্ঞতা নেই, অথচ জাতীয় পত্রিকার সাংবাদিক। একটি টাকাও বেতন পায় না, অথচ অবৈধ আয়ে কোটিপতি না হলেও লাখোপতি। কেউ বলতে পারবে না তাদের আয়ের এর উৎস কি। নির্দিষ্ট কোন উৎস নেই। যদি প্রশ্ন করেন, ভাই আপনাকে তো কোন কাজ করতে দেখিনা শুধু শুধু বসে থাকেন করেনটা কি?  উত্তরে নিজের পরিচয় ঠিক এভাবে দিচ্ছে, বলছে, ‘আমি একজন পেশাধারী বড়মাপের সাংবাদিক। আমাকে চিনে না এমন লোক তো দেখিনা!’ পঞ্চম শ্রেণির গন্ডি পার হতে পারেনি কিন্তু সাংবাদিকতার পরিচয়পত্র নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে অনেক টাউট বাটপার। এসএসসি পাস না করেও ফেসবুক প্রোফাইলে লেখে উচ্চশিক্ষিত। একাডেমিক সার্টিফিকেট নেই। নিজের নাম লিখতে পারেনা। পেটে বিদ্যা বলে কিছু নেই। সংবাদ লেখার যোগ্যতা নেই অথচ সাংবাদিক। সম্পাদনা করার মেধা নেই অথচ সম্পাদক। দু’লাইন, দু’কলম শুদ্ধ বাংলা বলতে ও লিখতে পারেনা অথচ তারা রিপোর্টার! যে জানেনা কোনটা সংবাদ, কোনটা সংবাদ না, বা একটা প্রতিবেদন কিভাবে লিখতে হয় তার কোন জ্ঞান নেই সে হয়ে যায় মস্ত বড় প্রতিবেদক, কলামিষ্ট ও লেখক ! এ হচ্ছে সংবাদপত্র জগতের একটি ভয়ংকর চিত্র। এগুলো থেকে অপসাংবাদিকতা বিস্তার লাভ করেছে চারদিকে। আর এই অপসাংবাদিকতার বিকৃত আরেকটি প্রচলিত শব্দ হচ্ছে ‘হলুদ সাংবাদিকতা’। আছে বাহারি পরিচয়পত্র। সংবাদপত্র মালিক বিনা বেতনে যখন কাজ করার লোক পাবেন তখন বেতন দিয়ে লোক নিয়োগ করবেন কেন। পত্রিকার সম্পাদকরা টাকা নিয়ে এদের কার্ড দিচ্ছে। বাজারের চাল ডালের মত টাকার বিনিময়ে এখন প্রেস কার্ড নাকি কিনতে পাওয়া যায়। নিয়োগের ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতার বালাই নেই। সম্পাদকের সংগে যদি ভাল সম্পর্ক থাকে অথবা দু-চারটে বিজ্ঞাপন দিলে তো আর কথায় নেই, প্রেস কার্ড প্রাপ্তি নিশ্চিত! এর জন্য পত্রিকার সম্পাদকরাই শতভাগ দায়ী। এরা প্রকৃত সাংবাদিকদের সাংবাদিকতার ইচ্ছেটা শেষ করে দিচ্ছে।
সাংবাদিকতার এ মহান পেশা ক্রমান্বয়ে কলুষিত হয়ে আসছে। সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, সাংবাদিকের স্বাধীনতার নামে এক ধরনের অপসাংবাদিকতার প্রয়োগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ঠিক যেন ‘চেরাগের নিচে অন্ধকার’। বিভিন্ন লেজুড়ভিত্তিক রাজনৈতিক দলের কর্মী, অর্থলোভী, স্বার্থান্বেষী, টাউট-বাটপার, প্রতারক, নেশাখোর, চাঁদাবাজ, তথ্য গোপনকারী, বদমায়েশ টাইপের লোক, নারীলোভী, মাদক পাচারকারী, ঠগ, ধান্ধাবাজ, সন্ত্রাসীসহ বিভিন্ন অপকর্মে জড়িত ব্যক্তিরা এখন সাংবাদিকতার কার্ড ঝুলিয়ে বিচরণ করছে। কারো হাতে লোগোসহ মাইক্রোফোন, কারো কাঁধে ভিডিও ক্যামেরা, আর কারো হাতে ক্যামেরা স্ট্যান্ড, গলায় ঝুলনো থাকছে প্রেস লেখা চওড়া ফিতায় আইডি কার্ড। সকাল থেকেই ছুটে চলে অবিরাম। কখনো জন-প্রতিনিধিদের সাক্ষাৎকার ছাপানোর নামে ২ থেকে ৫ হাজার টাকা নেয়া, আবাসিক হোটেলে গিয়ে সাংবাদিক পরিচয়ে চাঁদাবাজি করা, জমি দখল মুক্ত করে দেয়া এবং সরকারি চাকরি পাইয়ে দেয়ার নাম করে লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়াই এই চক্রটির প্রধান কাজ। সাংবাদিকতার নামে এভাবেই চলছিলো তাদের প্রতারণা। তারা জেনে শুনেই ব্যাখ্যার স্থলে অপব্যাখ্যা, ন্যায়কে অন্যায়ের রূপ দান, সত্যকে ঢাকার জন্য অসত্যের আবরণ দেওয়াকে মনে করেন সাংবাদিকতার বিজ্ঞতা!
মুরগির ডিম ভাগাভাগি নিয়ে ঝগড়া হলেও সেখানে ওইসব কথিত সাংবাদিকরা হাজির হয়। ভিডিও করে। নোট নেয়। মনে হয় অফিস তাদের বিরাট অ্যাসাইনমেন্ট দিয়েছে। এর জন্য দায়ী হচ্ছে আন্ডারগ্রাউন্ড পত্রিকার মালিক, অনলাইন নিউজ পোর্টাল এবং অনলাইন বা আইপি টিভিগুলো। কেউ রিপোর্ট করলে একশ্রেণীর বাটপাররা পত্রিকা হাতে ছুটে যায় পক্ষ কিংবা বিপক্ষ লোকের কাছে। প্রতিবাদ দেবার নাম করে কিংবা ভাল করে লিখে দেবার নাম করে কৌশলে তাদের কাছ থেকে টাকা-পয়সা হাতিয়ে নেয়। এটা তাদের কাছে ডিজিটাল পদ্ধতি।
এরা এখন ফেসবুক পেজে যা খুশি তাই পোস্ট দিচ্ছে। শিষ্টাচারের বালাই নেই। ফেসবুক পোস্টে ১০টি শব্দের মধ্যে ৬টি বানান ভুল। এরা সমাজের একশ্রেণীর নিম্নমানের ভাইরাস। শার্শা উপজেলায় এরকম সাংবাদিকের সংখ্যা নাকি ৩ হাজার ৫০০ জন। দিন দিন এই সংখ্যা আরো বাড়ছে। গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের কোন জেলায় তো নয়ই, কোন বিভাগ পর্যায়েও এত সাংবাদিক নেই। আর সাতক্ষীরার নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা যায়, নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করার জন্য ৪ হাজার আবেদন পড়েছিল। সেখানে কেবল লাইন মেরামত কর্মী থেকে শুরু করে পল্ট্রি মুরগির ব্যবসায়ীরাও ছিল।
বেনাপোল ও ভোমরা সীমান্তে এমন মালের অভাব নেই। সোনা চোরাকারবারি, হেরোইন ব্যবসায়ীরাও লাখ লাখ টাকা দিয়ে নামিদামি পত্রিকার পরিচয় পত্র নিয়ে আসছে। পুলিশ ও আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর হাত থেকে রেহাই পেতে এভাবে তারা পরিচয়পত্র সংগ্রহ করছে। করছে চামচামী। এর সীমাও অতিক্রম করেছে তারা।
এরা নম্বর প্লেট বিহীন মোটর সাইকেলের মালিক। গাড়িতে প্রেস স্টিকার লাগায়। মোটর সাইকেলের সামনে-পেছনে প্রেস লেখা। লেখে সাংবাদিক কিংবা পত্রিকার নাম। যশোরের পালবাড়ির মোড়ে দাঁড়ালে দেখা যায় সড়ক দিয়ে চলাচল করা ১০০ মোটরসাইকেল এর মধ্যে ২০টাই প্রেস লেখা। পাড়া-মহল্লায় রাজার হালে ঘুরে বেড়ায়। দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সর্বত্র। সাতক্ষীরা, যশোর, ঝিকরগাছা, বেনাপোল, শার্শা, কেশবপুর, কোটচাঁদপুর, ঝিনেদা, খুলনা, রাজবাড়ী, এই ব্যবসা চলছে সব জায়গায়। রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের সাথে এদের রয়েছে নিবিড় সখ্যতা। এরা সুবিধাবাদী। অন্য কারো নয়। আবার নামধারী মানবাধিকার কর্মী। এরা শুধু নিজের স্বার্থের জন্যই ছোটে। মূলত এরা বহুরূপী। ওরাই বর্তমান কলির কৃষ্ণ। আচরণ নতুন কোন রাজনৈতিক দলের কর্মীর মতো। সাংবাদিক নামের সাংঘাতিকদের অহমিকতা, দাম্বিকতা, পরচর্চা, প্রতারণা, পেশাদারীর নামে অন্যের প্রতি কাল্পনিক বদনাম রটানো, নিজ স্বার্থ হাসিলে এ রকম নিয়ম বহির্ভুত ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের দৌরাত্ব দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। এধরনের সাংবাদিকদের সাংঘাতিক দাপটে বিভিন্ন এলাকার নিরীহ জনসাধারণ অতিষ্ঠ হয়ে উঠছে।
এখন কম বেশী সবারই নজর থাকে সাংবাদিক হওয়ার দিকে। সেটি সংবাদপত্র, রেডিও, অনলাইন পত্রিকা হোকনা ফেইসবুক পেইজ। এসব আন্ডারগ্রাউন্ড পত্রিকার পাশাপাশি ঘরে বসে অনলাইন পোর্টাল খুলে নানা জায়গা থেকে নিউজ কপি পেস্ট করেও অনেক নামধারী সাংবাদিক জন্ম হয়েছে। আবার ফেসবুক, ইউটিওবে কোন প্রকার পত্রিকা বা টিভির নামে একটি আইডি খুলতে পারলেই হয়ে যায় ‘গর্ভবতী সম্পাদক’। আর দেশব্যাপি বিক্রি করতে পারে আইডি কার্ড। নাম লিখতে কলম ভাঙলেও সমস্যা নেই। মাসে মাসে পাবেন টাকা, বেশ পীর সাহেবের মত খাবে-দাবে, ঘুমাবে আহা কি মজা, অনেক বড় ‘গর্ভবতী সম্পাদক’। আর যে এলাকায় অফিস করবে তার আশপাশে গড়ে ওঠা বিভিন্ন অসামাজিক প্রতিষ্ঠান থেকে পাবে মাসিক হাদিয়া।
সাংবাদিকতার নামে অপসাংবাদিকতা করে চলেছে। সাংবাদিকতার সুনাম-সুখ্যাতি বিনষ্ট হচ্ছে। পত্রিকাওয়ালারাও এদের পছন্দ করে। এদের প্রতিরোধ করা এখন আর সম্ভব নয়। এদের শেকড় অনেক গভীরে। কোন কোন সিনিয়র সাংবাদিকরাও এদের লালন-পালন করে। ফলে যা হবার তাই হচ্ছে। প্রকৃত সাংবাদিকদের জন্য এরা বিষফোড়া। প্রকৃত সাংবাদিকরা খুব বিব্রতকর অবস্থায় আছে। এরাই বেশি পাওয়ারফুল। বেশির ভাগ মানুষ এদেরই সাংবাদিক হিসেবে জানে চেনে। সাংবাদিকতার লেবাস পরে এদের অনেকে কত যে নীচতা, হীনতা, দীনতা আর সংকীর্ণতায় আকন্ঠ নিমজ্জিত থাকে, তা বলতেও লজ্জা হয়। এরা ভাবে আমি সাংবাদিক, আমার হাতে কলম আছে, কাগজ আছে, তাই যা খুশি লিখবো! সবার মাথা আমি কিনে নিয়েছি। লেখার স্বাধীনতা মানে অন্যের অধিকার, সামাজিক অবস্থান, মান-সম্মানকে উপেক্ষা করা নয়। সাংবািিদকতাকে আজ ‘ভেড়ায় ক্ষেত খাওয়ার’ মতো মর্মান্তিক ভূমিকার দিকে ঠেলে দিয়েছে। দেখা যাবে, কারোর বাড়ির পয়তালি¬শ বছর বয়সী পাগলা মকবুল যে কিনা মাঝে মাঝে লুঙ্গী খুলে এখনো খালে লাফ দেয়, অকারণে হাসে, সেও দাবী করে না বসে যে, আমিও সাংবাদিক।
তথ্যসুত্রঃ বিভিন্ন দৈনিক পত্রপত্রিকাসমুহের অংশবিশেষ।

Leave a Reply

     এই বিভাগের আরও খবর
error: Content is protected !!
%d bloggers like this: